বর্ণালী কাকে বলে ? বর্ণালী কিভাবে সৃষ্টি হয় ?

বর্ণালী কাকে বলে এবং বর্ণালী কিভাবে সৃষ্টি হয় ব্যাখ্যা করা হলো

বর্ণালী কাকে বলে

কোন মাধ্যমে প্রতিসরণের ফলে যৌগিক আলোর বিচ্ছুরণের জন্য মূল রংগুলোর যে পট্টি পাওয়া যায় তাকে বর্ণালী বলে।

বর্ণালী কিভাবে সৃষ্টি হয়

আমরা জানি, আলোক রশ্মি যখন এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অপর স্বচ্ছ মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন আলোক রশ্মি বিভেদতলে বেঁকে যায়। এই বাকার পরিমাণ মাধ্যমদ্বয়ের প্রকৃতি ও আলোর রঙের উপর নির্ভর করে। সূর্যের সাদা আলো সাতটি রঙের সমন্বয়ে সৃষ্টি তাই যখন সূর্যের সাদা আলো কোন প্রিজমের মধ্যে প্রবেশ করে তখন প্রতিসরণের ফলে রশ্মির গতিপথ বেঁকে যায়। এখন ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের আলোর বাঁকার পরিমাণ ভিন্ন হওয়ার জন্য প্রিজমের মধ্যে সাদা আলো সাতটি বর্ণে বিশ্লিষ্ট হয় এবং এই বিশ্লিষ্ট অবস্থায়ই প্রায় প্রিজম থেকে নির্গত হয়। ফলে পর্দার উপর আমরা বর্ণালী দেখতে পাই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বর্ণভেদে আলোক রশ্মির বাকার পরিমাপ বিভিন্ন কেন? শূন্য মাধ্যমে সবক’টি বর্ণের আলোক রশ্মি একই বেগে চলে। কিন্তু অন্য যে কোন মাধ্যমে এক এক বর্ণের আলোর বেগ এক এক রকমের হয়। যেমন কাচের মধ্যে লাল রঙের আলোর বেগ, বেগুনি রঙের আলোর বেগের প্রায় 1.8 গুণ বেশি। তাই বেগুনি আলো সবচেয়ে বেশি এবং লাল আলো সবচেয়ে কম বাঁকে। ফলে বর্ণালী উৎপন্ন হয়। এ কারণে একই মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক ভিন্ন ভিন্ন রঙের জন্য বিভিন্ন হয়। সুতরাং বলা যায়, বিভিন্ন বর্ণের আলোর জন্য মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্কের বিভিন্নতার জন্য বর্ণালী উৎপন্ন হয়।

সৌর বর্ণালী Solar Spectra

বর্ণালী কাকে বলে

সূর্যের আলো থেকে আমরা যে বর্ণালী পাই তাকে সৌর বর্ণালী বলে। সৌর বর্ণালী সাধারণভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একে সাতটি বর্ণের অবিচ্ছিন্ন বর্ণালী মনে হয়। কিন্তু বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা সৌর বর্ণালীকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, ঐ বর্ণালীতে অসংখ্য কালো রেখা রয়েছে। এই কালো রেখাগুলোর অবস্থান সুনির্দিষ্ট। এ থেকে বলা যায়, সৌর বর্ণালী প্রকৃতপক্ষে কালো রেখা শোষণ বর্ণালী। ১৮০২ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী ওল্যাস্টন সর্বপ্রথম এই রেখাগুলো লক্ষ করেন। পরে ১৮০৪ সালে জার্মান বিজ্ঞানী যোসেফ ভন ফ্রন্‌হফার (J. Von Fraunhoffer) এই রেখাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। সে জন্য এই রেখাগুলোকে ফ্রন্হুফার রেখা (Fraunhoffer line) বলে। তিনি এই রেখাগুলোকে ইংরেজি বর্ণমালার অক্ষরগুলো দ্বারা নামকরণ করেন। A রেখা লাল বর্ণের এক প্রান্তে অবস্থিত, B ও C রেখা ছিল লাল বর্ণের মধ্যস্থলে, D রেখা হলুদ ও কমলা স্থানে, E সবুজ, F ও G নীল, II ও রেখা বেগুনি অঞ্চলে অবস্থিত। সৌর বর্ণালীতে প্রায় সাতশ কালো রেখা পাওয়া গেছে।

ফ্রন্‌হফার রেখার উৎপত্তির কারণ:

জার্মান বিজ্ঞানী কারসফ (Kirchoff) সৌর বর্ণালীতে কালো রেখা উৎপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করেন। বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে, অধিক উষ্ণতায় কোন বস্তু থেকে যে সকল রশ্মি নির্গত হয় অল্প উষ্ণতায় ঐ পদার্থ সেই রশ্মিগুলো শোষণ করে।

সূর্যের কেন্দ্রস্থল আলোকমণ্ডল বা ফটোস্ফিয়ার (Photosphere) একটি সাদা কঠিন পদার্থে তৈরি। এর তাপমাত্রা কয়েক কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। আলোকমণ্ডলকে ঘিরে আছে অপেক্ষাকৃত শীতল বর্ণমণ্ডল বা ক্রমোস্ফিয়ার (Chromosphere) এর তাপমাত্রা কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। আলোকমণ্ডল থেকে সাদা আলো যখন অপেক্ষাকৃত শীতল বর্ণমণ্ডলে প্রবেশ করে তখন সেই স্থানের পরমাণু স্ব-স্ব ধর্মানুসারে বিশেষ বর্ণের আলোক শোষণ করে। এই আলো যখন পৃথিবীতে আসে তখন এর বর্ণালী অবিচ্ছিন্ন থাকলেও শোষিত অংশে কালো রেখা দেখা যায়। এগুলোই ফ্রনফার কালো রেখা।

ফ্রনহফার রেখা বিশ্লেষণ করে সূর্যের বর্ণমণ্ডলে কী কী মৌলিক পদার্থ রয়েছে তা নির্ণয় করা যায়। এভাবে সৌর বর্ণালী পর্যালোচনা করে সূর্যের আবহমণ্ডলে পৃথিবীর প্রায় 50টি মৌলিক পদার্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে সোনা, রুপা বা পারদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সকল ফ্রনহফার রেখাই যে সৌর বর্ণমণ্ডলের বাষ্প দ্বারা শোষণের ফলে উৎপন্ন তা ঠিক নয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাষ্প দ্বারা শোষণের ফলেও কিছু কিছু কালো রেখা উৎপন্ন হয়। এদেরকে টেলুরিক রেখা (telluric line) বলে।

আলোর বিচ্ছুরণ কাকে বলে ? প্রিজমে আলোর বিচ্ছুরণ ব্যাখ্যা কর ?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top